বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, ক্রমহ্রাসমান বিনিয়োগ এবং তলানিতে ঠেকা রফতানি প্রবৃদ্ধির কারণে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শিল্প ও বাণিজ্য খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও তার সামান্যতমই বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা আরো বেশি ঘনীভূত হয়েছে।
রাজধানীর মতিঝিলে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবগঠিত সরকারের কাছে ডিসিসিআইয়ের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ডিসিসিআই। এতে আর্থিক খাত, জ্বালানি, শিল্পায়ন, শুল্কায়ন, লজিস্টিক অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংগঠনটির দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘অপরিবর্তিত পলিসি রেটের কারণে ব্যবসায়ীদের ১৬-১৭ শতাংশ হারে ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং ঋণ শ্রেণীকরণের সীমা নয় থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনার কারণে আর্থিক খাতে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরি করেছে।’
তিনি দাবি করেন, শিল্প-কারখানায় চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ না থাকার পাশাপাশি নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে যথাক্রমে ৪০ ও ৪২ টাকা বৃদ্ধির কারণে পণ্য উৎপাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা স্থানীয় চাহিদা ও রফতানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এছাড়া শিল্পবিষয়ক নীতিমালার ধারাবাহিকতার অনুপস্থিতি, ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অসহনীয় চাঁদাবাজির বিষয়টি স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনায় আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।
দেশের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয় না হওয়ায় রাজস্ব প্রদানে ব্যক্তিশ্রেণীর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রেই অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘অনেকেই করজালের বাইরে থাকায় সরকার রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের গতিও শ্লথ হচ্ছে। দেশের লজিস্টিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, জমির উচ্চমূল্য ও অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিভিন্ন সেবার হার গড়ে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নদীপথের কার্যকর ব্যবহার না থাকার কারণে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়ছে। ফলে পণ্য উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।’
এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘আঙ্কটাডের হিসাব অনুযায়ী, এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের রফতানি সাড়ে ৫-৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, যা আর্থিক হিসাবে প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।’ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও স্থানীয় অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনায় বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কমপক্ষে তিন বছর পিছিয়ে নেয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী এবং সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ ব্যবসায়ী নেতারা।